উমরাহ গাইড
উমরাহ করার নিয়ম: ধাপে ধাপে পূর্ণাঙ্গ গাইড
প্রথমবার উমরাহ করছেন? ইহরাম থেকে চুল কাটা পর্যন্ত প্রতিটা কাজ সহজ ভাষায়, দোয়াসহ।
উমরাহর মূল ৪টি কাজ
এক নজরে পুরো উমরাহ
1. যাত্রার আগে প্রস্তুতি
ভালো প্রস্তুতি নিলে উমরাহ অনেক সহজ হয়।
- কাগজপত্র: কমপক্ষে ৬ মাস মেয়াদের পাসপোর্ট, উমরাহ ভিসা, টিকেট ও হোটেল বুকিং, সবকিছুর প্রিন্ট ও মোবাইলে কপি রাখুন।
- সরকারি চাকরিজীবী: আপনি সরকারি চাকরি করলে অবশ্যই অফিসের ছুটির অনুমতিপত্র (GO বা NOC) সাথে রাখুন। না থাকলে এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশন থেকেই ফিরে আসতে হতে পারে।
- Nusuk অ্যাপ: মোবাইলে Nusuk অ্যাপ নামিয়ে রাখুন। মদিনায় রিয়াজুল জান্নাহ (রওজা শরীফ) যিয়ারতের অনুমতি এই অ্যাপ থেকে নিতে হয়। আমরা সেটআপে সাহায্য করি।
- ইহরামের কাপড়: পুরুষদের জন্য দুই টুকরা সাদা সেলাইবিহীন কাপড় (একটা পরার, একটা গায়ে দেওয়ার), গোড়ালি খোলা স্যান্ডেল। নারীরা স্বাভাবিক শালীন পোশাকেই ইহরাম বাঁধবেন।
- অন্যান্য: নিয়মিত ওষুধ ও প্রেসক্রিপশন, ছোট ব্যাগ (জুতা রাখার জন্য), আরামদায়ক স্যান্ডেল, পানির বোতল, ভ্যাকসিন সার্টিফিকেট যদি লাগে।
- শেখা: তালবিয়া ও ছোট দোয়াগুলো যাত্রার আগেই মুখস্থ করে ফেলুন।
2. মিকাত ও ইহরাম ফরজ
মিকাত হলো সেই সীমানা যা ইহরাম ছাড়া পার হওয়া যায় না। ঢাকা থেকে জেদ্দাগামী ফ্লাইটে জেদ্দায় নামার আগেই আকাশে মিকাত পার হয়, তাই ফ্লাইটেই (বা আগেই) ইহরাম বাঁধতে হবে। বিমানের ক্রু সাধারণত ঘোষণা দেয়। আগে মদিনা গেলে মদিনা থেকে মক্কা যাওয়ার সময় যুল হুলাইফা (আবইয়ার আলি) থেকে ইহরাম বাঁধবেন।
- নখ ও অবাঞ্ছিত লোম কেটে গোসল বা অজু করুন (বাসায় বা ঢাকা এয়ারপোর্টে)। পুরুষরা শরীরে (কাপড়ে নয়) সুগন্ধি লাগাতে পারেন।
- পুরুষরা ইহরামের দুই টুকরা কাপড় পরুন; নারীরা শালীন পোশাক, মুখ ও হাত খোলা থাকবে।
- মাকরূহ সময় না হলে দুই রাকাত সুন্নত নামাজ পড়ুন (ফ্লাইটে সম্ভব না হলে আগেই)।
- মিকাত পার হওয়ার আগে উমরাহর নিয়ত করুন এবং তালবিয়া পড়ুন। নিয়ত ও তালবিয়া পড়ার সাথে সাথে আপনি ইহরাম অবস্থায় চলে গেলেন।
- এরপর থেকে মসজিদুল হারামে তাওয়াফ শুরুর আগ পর্যন্ত বারবার তালবিয়া পড়তে থাকুন, পুরুষ জোরে, নারী নিচু স্বরে।
উমরাহর নিয়ত
اللّٰهُمَّ إِنِّي أُرِيدُ الْعُمْرَةَ فَيَسِّرْهَا لِي وَتَقَبَّلْهَا مِنِّي
Allāhumma innī urīdul ‘umrata fa yassirhā lī wa taqabbalhā minnī
হে আল্লাহ, আমি উমরাহ করতে চাই, তা আমার জন্য সহজ করে দিন এবং আমার পক্ষ থেকে কবুল করুন।
তালবিয়া
لَبَّيْكَ اللّٰهُمَّ لَبَّيْكَ، لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ، إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ، لَا شَرِيكَ لَكَ
Labbaik Allāhumma labbaik, labbaika lā sharīka laka labbaik, innal ḥamda wan ni‘mata laka wal mulk, lā sharīka lak
আমি হাজির, হে আল্লাহ, আমি হাজির। আমি হাজির, আপনার কোনো শরিক নেই, আমি হাজির। নিশ্চয়ই সব প্রশংসা, নিয়ামত ও রাজত্ব আপনারই, আপনার কোনো শরিক নেই।
3. ইহরাম অবস্থায় যা করা যাবে না
ইহরাম বাঁধার পর থেকে চুল কাটা পর্যন্ত এই কাজগুলো নিষেধ। ভুলে হয়ে গেলে একজন আলেমকে জিজ্ঞেস করে নিন, কিছু ক্ষেত্রে দম বা সদকা দিতে হয়।
নারী ও পুরুষ সবার জন্য
- চুল, দাড়ি বা নখ কাটা/ছেঁড়া
- সুগন্ধি ব্যবহার (সুগন্ধি সাবান, আতর, সুগন্ধি টিস্যুসহ)
- স্বামী ও স্ত্রীর মিলন ও তার দিকে নিয়ে যায় এমন আচরণ
- বিয়ের আকদ করা
- শিকার করা
- ঝগড়া, গালি ও অশালীন কথা
শুধু পুরুষদের জন্য / শুধু নারীদের জন্য
- পুরুষ: সেলাই করা জামা, প্যান্ট, মোজা বা পা ঢাকা জুতা পরা যাবে না
- পুরুষ: মাথা ও মুখ ঢাকা যাবে না (ছাতা ব্যবহার করা যায়)
- নারী: নিকাব (মুখে লাগানো) ও হাতমোজা পরা যাবে না
- যা করা যায়: গোসল (সুগন্ধি ছাড়া), ঘড়ি, চশমা, বেল্ট/কোমরের ব্যাগ, স্যান্ডেল
4. মক্কায় পৌঁছে মসজিদুল হারামে প্রবেশ
- হোটেলে মালপত্র রেখে বিশ্রাম ও অজু করে নিন। ইহরাম অবস্থাতেই থাকবেন।
- ডান পা দিয়ে মসজিদে প্রবেশ করুন এবং মসজিদে প্রবেশের দোয়া পড়ুন।
- কাবা শরীফ প্রথম চোখে পড়লে মন ভরে দোয়া করুন, এটা দোয়া কবুলের সময়।
- জুতা ব্যাগে রাখুন বা নির্দিষ্ট জায়গায় রাখুন এবং গেট নম্বর মনে রাখুন (ছবি তুলে রাখতে পারেন)।
মসজিদে প্রবেশের দোয়া
بِسْمِ اللّٰهِ، وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلَى رَسُولِ اللّٰهِ، اللّٰهُمَّ افْتَحْ لِي أَبْوَابَ رَحْمَتِكَ
Bismillāh, waṣ ṣalātu was salāmu ‘alā Rasūlillāh, Allāhummaftaḥ lī abwāba raḥmatik
আল্লাহর নামে, রাসূলুল্লাহর ওপর সালাত ও সালাম। হে আল্লাহ, আমার জন্য আপনার রহমতের দরজাগুলো খুলে দিন।
5. তাওয়াফ: কাবার চারপাশে ৭ চক্কর ফরজ
অজু অবস্থায় তাওয়াফ করতে হবে। কাবা সবসময় আপনার বাম দিকে থাকবে। হাজরে আসওয়াদের কোণ থেকে শুরু করে আবার সেখানে ফিরে এলে এক চক্কর।
- তাওয়াফ শুরুর আগে তালবিয়া পড়া বন্ধ করুন। পুরুষরা ইযতিবা করবেন, চাদরের মাঝখান ডান বগলের নিচে দিয়ে ডান কাঁধ খোলা রাখবেন (শুধু এই তাওয়াফে)।
- হাজরে আসওয়াদের বরাবর (মেঝেতে/দেয়ালে সবুজ বাতি চিহ্ন) দাঁড়িয়ে কাবার দিকে মুখ করুন, ডান হাত তুলে ইশারা করুন (ইস্তিলাম) ও দোয়া বলুন। ভিড়ে পাথর ছোঁয়ার চেষ্টা করবেন না, ইশারাই যথেষ্ট।
- কাবাকে বাম দিকে রেখে হাঁটা শুরু করুন। প্রথম ৩ চক্করে পুরুষরা ছোট ছোট পদক্ষেপে একটু দ্রুত হাঁটবেন (রমল), বাকি ৪ চক্কর স্বাভাবিক।
- তাওয়াফে কোনো নির্দিষ্ট দোয়া বাধ্যতামূলক নয়, নিজের ভাষায় দোয়া, জিকির বা কুরআন তেলাওয়াত করুন।
- রুকনে ইয়ামানি (হাজরে আসওয়াদের আগের কোণ) থেকে হাজরে আসওয়াদ পর্যন্ত "রাব্বানা আতিনা…" দোয়াটি পড়ুন।
- প্রতি চক্কর শেষে হাজরে আসওয়াদ বরাবর এসে আবার ইশারা করে পরের চক্কর শুরু করুন। মোট ৭ চক্কর গুনে রাখুন (হাতের কাউন্টার সাহায্য করে)।
- তাওয়াফের মাঝে অজু ভেঙে গেলে অজু করে এসে যেখান থেকে থেমেছিলেন সেখান থেকে বাকিটা পূরণ করুন।
হাজরে আসওয়াদের দিকে ইশারা করার সময়
بِسْمِ اللّٰهِ، اللّٰهُ أَكْبَرُ
Bismillāhi, Allāhu akbar
আল্লাহর নামে, আল্লাহ সবচেয়ে বড়।
রুকনে ইয়ামানি ও হাজরে আসওয়াদের মাঝে
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
Rabbanā ātinā fid dunyā ḥasanatan wa fil ākhirati ḥasanatan wa qinā ‘adhāban nār
হে আমাদের রব, আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দিন, আখিরাতেও কল্যাণ দিন এবং জাহান্নামের আজাব থেকে রক্ষা করুন।
নারীরা রমল ও ইযতিবা করবেন না, ভিড় এড়িয়ে চলবেন। মাসিক অবস্থায় তাওয়াফ করা যায় না, পবিত্র হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়; এমন অবস্থায় একজন আলেমের পরামর্শ নিন।
6. তাওয়াফের পর দুই রাকাত নামাজ ও জমজম ওয়াজিব
- পুরুষরা ডান কাঁধ ঢেকে নিন (ইযতিবা শেষ)।
- সম্ভব হলে মাকামে ইবরাহিমের পেছনে, ভিড় থাকলে মসজিদের যেকোনো জায়গায় দুই রাকাত নামাজ পড়ুন। সুন্নত হলো প্রথম রাকাতে সূরা কাফিরুন, দ্বিতীয় রাকাতে সূরা ইখলাস।
- এরপর পেট ভরে জমজমের পানি পান করুন এবং দোয়া করুন।
7. সাঈ: সাফা ও মারওয়ার মাঝে ৭ বার ওয়াজিব
সাঈ সাফা পাহাড় থেকে শুরু হয়ে মারওয়ায় শেষ হয়। সাফা থেকে মারওয়া = ১ বার, মারওয়া থেকে সাফা = ২য় বার; এভাবে ৭ম বার মারওয়ায় শেষ।
- সাফা পাহাড়ে উঠে কাবার দিকে মুখ করুন এবং প্রথমবার আয়াত ও "আবদাউ বিমা…" পড়ুন।
- হাত তুলে তাকবির ও তাহলিল পড়ে দোয়া করুন, তারপর মারওয়ার দিকে হাঁটুন।
- দুই সবুজ বাতির মাঝখানে পুরুষরা একটু দৌড়ের মতো দ্রুত হাঁটবেন; নারীরা স্বাভাবিকভাবে হাঁটবেন।
- মারওয়ায় পৌঁছে কাবার দিকে মুখ করে একইভাবে দোয়া করুন। এভাবে মোট ৭ বার।
- সাঈর জন্য অজু থাকা উত্তম, তবে বাধ্যতামূলক নয়। ক্লান্ত হলে বিশ্রাম নেওয়া যায়; হুইলচেয়ারের ব্যবস্থাও আছে।
সাফায় প্রথমবার
إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللّٰهِ، أَبْدَأُ بِمَا بَدَأَ اللّٰهُ بِهِ
Innaṣ ṣafā wal marwata min sha‘ā’irillāh, abda’u bimā bada’allāhu bih
নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনগুলোর অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ যা দিয়ে শুরু করেছেন আমি তা দিয়ে শুরু করছি।
সাফা ও মারওয়ায় প্রতিবার
اللّٰهُ أَكْبَرُ، اللّٰهُ أَكْبَرُ، اللّٰهُ أَكْبَرُ، لَا إِلٰهَ إِلَّا اللّٰهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
Allāhu akbar, Allāhu akbar, Allāhu akbar, lā ilāha illallāhu waḥdahū lā sharīka lah, lahul mulku wa lahul ḥamdu wa huwa ‘alā kulli shay’in qadīr
আল্লাহ সবচেয়ে বড় (৩ বার)। আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তিনি এক, তাঁর কোনো শরিক নেই; রাজত্ব ও প্রশংসা তাঁরই, তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান।
8. মাথা মুণ্ডানো বা চুল ছোট করা: উমরাহ সম্পন্ন ওয়াজিব
- পুরুষ: পুরো মাথা মুণ্ডানো (হালক) উত্তম; অথবা পুরো মাথার চুল সমানভাবে ছোট করা (কসর)। মারওয়ার কাছেই অনেক সেলুন আছে।
- নারী: চুলের আগা থেকে আঙুলের এক কর (প্রায় এক ইঞ্চি) পরিমাণ কাটবেন, নিজে বা মাহরামের সাহায্যে, আড়ালে।
- চুল কাটার সাথে সাথে আপনার উমরাহ সম্পন্ন এবং ইহরামের সব নিষেধাজ্ঞা শেষ। গোসল করে স্বাভাবিক পোশাক পরুন। আলহামদুলিল্লাহ!
9. মদিনা যিয়ারত উমরাহর অংশ নয়
মদিনা যাওয়া উমরাহর অংশ নয়, কিন্তু প্রায় সব প্যাকেজেই থাকে এবং বড় সৌভাগ্যের বিষয়।
- মসজিদে নববীতে নামাজ পড়ুন, এখানে এক নামাজ অন্য মসজিদের চেয়ে বহু গুণ সওয়াবের।
- রিয়াজুল জান্নাহ (রওজা শরীফ) তে নামাজের জন্য Nusuk অ্যাপে আগে থেকে সময় বুক করতে হয়।
- রাসূলুল্লাহ ﷺ, আবু বকর (রা.) ও উমর (রা.) কে আদবের সাথে সালাম দিন।
- সময় থাকলে মসজিদে কুবা, উহুদ পাহাড় ও জান্নাতুল বাকি যিয়ারত করুন, আমাদের প্যাকেজে যিয়ারা ট্যুর থাকে।
এই গাইডে বাংলাদেশে প্রচলিত সাধারণ নিয়ম সহজভাবে দেওয়া হয়েছে। নিজের বিশেষ অবস্থার (অসুস্থতা, মাসিক, ভুল হয়ে যাওয়া) জন্য একজন বিশ্বস্ত আলেমের পরামর্শ নিন। আমাদের গ্রুপে অভিজ্ঞ গাইড থাকেন।
সাধারণ প্রশ্ন
মক্কায় পৌঁছানোর পর তাওয়াফ, নামাজ, সাঈ ও চুল কাটা মিলিয়ে সাধারণত ৩ থেকে ৫ ঘণ্টা লাগে, ভিড়ের ওপর নির্ভর করে।
হ্যাঁ, হজের কয়েকটা দিন ছাড়া বছরের যেকোনো সময় উমরাহ করা যায়। রমজানে উমরাহর বিশেষ ফজিলত আছে, তবে ভিড় ও খরচ বেশি থাকে।
সৌদি আরবের বর্তমান নিয়মে নির্দিষ্ট বয়সের নারীরা গ্রুপের সাথে যেতে পারেন, তবে ধর্মীয় দিক থেকে আলেমদের মত জেনে নিন। ভিসার সর্বশেষ নিয়ম আমরা যাচাই করে জানাই।
সরাসরি মক্কা গেলে মিকাত পার হওয়ার আগে, অর্থাৎ ফ্লাইটেই নিয়ত করতে হবে। অনেকে সুবিধার জন্য ঢাকা এয়ারপোর্টে ইহরামের কাপড় পরে নেন এবং মিকাতের আগে নিয়ত করেন।
উমরাহ প্যাকেজ, ভিসা ও টিকেট: সব এক জায়গায়
আপনার তারিখ, বাজেট ও হোটেল পছন্দ জানালে আমরা পুরো উমরাহ সাজিয়ে দেব।